শেয়ার বাজার

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বেড়েছে গমের চাহিদা, আমদানিতে রেকর্ডের আশা

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বেড়েছে গমের চাহিদা, আমদানিতে রেকর্ডের আশা

• বিশ্ববাজারে দাম কম

• খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে বাড়ছে চাহিদা

• নির্বাচনের কারণেও বাড়তি প্রস্তুতি


বিশ্ববাজারে দাম কম, দেশেও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে চাহিদা বাড়ছে গমের তৈরি খাবারের। এরমধ্যে সামনে নির্বাচন, তারপরে একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের। সবমিলিয়ে দেশে বাড়বে খাদ্যপণ্যের ব্যবসা। যার প্রস্তুতি হিসেবে এখন প্রচুর গম আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা।

২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে ৬৪ লাখ ৩৪ হাজার টন গম আমদানি হয়েছিল। এরপর বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গম আমদানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি কমে ৫৩ লাখ ৪২ হাজার টনে নেমে আসে। এর পরের বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমদানি আরও কমে যায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৪০ লাখ ১২ হাজার টন গম। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয় কৃষ্ণসাগরে অস্থিরতা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি আরও কমে নেমে আসে ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টনে।

তবে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেকর্ড ৭২ লাখ ৭৫ হাজার টন গম আমদানি করে বাংলাদেশ। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেটা কমে ৬২ লাখ ৩৫ হাজার টনে নামে। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৭ জানুয়ারি ২০২৬ সময়ে) ৩৫ লাখ ৭১ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে দেশে। আমদানিকারকরা বলছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগের আমদানির রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে এ অর্থবছর।

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে দেশে বাড়ছে গমের তৈরি খাবারের চাহিদা। অথচ, দেশে গমের উৎপাদন ১০ লাখ টনের ঘরে রয়ে গেছে। যে কারণে চাহিদার সিংহভাগ অর্থাৎ ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টন গম আমদানি করতে হচ্ছে।

আমদানি বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বিশ্ববাজারে গমের নিম্নমুখী দাম। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্ববাজারে প্রতি টন রাশিয়ান গম বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৩৫ ডলারে। মাঝারি প্রোটিনের আমেরিকান গমের দাম ২৬০ থেকে ২৭০ ডলার ও উচ্চমানের গমের দাম ২৯০ থেকে ৩০০ ডলারের মধ্যে।

এ দাম করোনা পরবর্তী কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত কম। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই ক্রমাগত কমছে গমের দাম। ২০২২ সালে গমের দাম ৫০০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে দেশে বাড়ছে গমের তৈরি খাবারের চাহিদা। অথচ, দেশে গমের উৎপাদন ১০ লাখ টনের ঘরে রয়ে গেছে। যে কারণে চাহিদার সিংহভাগ অর্থাৎ ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টন গম আমদানি করতে হচ্ছে।

এসব বিষয়ে কথা হয় টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহারের সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, মানুষ এখন আগের তুলনায় গমের খাদ্যপণ্য বেশি খাচ্ছে। আর যেহেতু দেশে সেভাবে গম উৎপাদন হচ্ছে না, সেহেতু বছরে উল্লেযোগ্য পরিমাণ গম আমদানি করতে হচ্ছে। এছাড়া এখন যেহেতু বিশ্ববাজারে দাম কম, সে কারণে অনেকে সুবিধা পাচ্ছে, তাই বেশি আমদানি করছে।

শফিউল আতহার আরও বলেন, গত এক বছর ধরে বিশ্ববাজার কিছুটা স্থিতিশীল। তবে মূলত বর্ধিত চাহিদার কারণেই ব্যবসায়ীরা আমদানি বাড়িয়েছেন।

আমদানিকারকরা বলছেন, মানুষ এখন আগের তুলনায় গমের খাদ্যপণ্য বেশি খাচ্ছে। গমের তৈরি খাদ্যপণ্যের রপ্তানিও বাড়ছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে অনেকেই ভাত খাওয়া কমিয়ে গমের খাবারের প্রতি ঝুঁকেছেন। দেশের অনেকেই এখন এক বেলা ভাত আর দুই বেলা রুটি খান।

মানুষ এখন আগের তুলনায় গমের খাদ্যপণ্য বেশি খাচ্ছে। গমের তৈরি খাদ্যপণ্যের রপ্তানিও বাড়ছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে অনেকেই ভাত খাওয়া কমিয়ে গমের খাবারের প্রতি ঝুঁকেছেন।

এছাড়া আসন্ন নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীল পরিস্থিতি ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বাড়াবে এমন প্রত্যাশাও ব্যবসায়ীদের। সেটিও আমদানি বৃদ্ধির একটি কারণ বলে জানান দেশের শীর্ষস্থানীয় খাদ্যশস্য আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, নির্বাচন একটি উৎসব। এ উৎসবকেন্দ্রিক একটি ভালো বেচাকেনা হওয়া স্বাভাবিক। এছাড়া রোজা ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ভালো ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা। যে কারণে সবাই একটু বাড়তি প্রস্তুতি নিচ্ছেন

আবুল বশর চৌধুরী আরও বলেন, সারা বিশ্বে তেল ছাড়া অন্যান্য সব খাদ্যশস্যের উৎপাদন ভালো। যে কারণে বৈশ্বিক ব্যবসা চাঙ্গা হচ্ছে, খাদ্যপণ্য রপ্তানিও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এক দশক আগে হাতেগোনা কয়েকটি শিল্প গ্রুপ খাদ্যপণ্য বাজারজাত করতো। চাহিদা বাড়ায় এখন বড় বড় শিল্প গ্রুপও খাদ্যপণ্যের ব্যবসায় নজর দিয়েছে। এসব শিল্প গ্রুপ খাদ্যপণ্য তৈরির জন্য প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ গম আমদানি করে। বর্তমানে নুডলস, বিস্কুট, পাউরুটি, চানাচুরসহ শুকনা খাবার এবং হিমায়িত খাদ্যপণ্য তৈরি হচ্ছে গম দিয়ে। এসব পণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আবার বিশ্বের প্রায় একশ দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

এছাড়া দেশে খাদ্যপণ্য তৈরির বড় বড় কারখানা, বেকারি, কনফেকশনারি ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় বেড়েছে আটার ব্যবহার। আবার গমের উপজাত ভুসি প্রাণী ও পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

সোনার দাম আরও কমলো, ভরি ২৫১১৮৪ টাকা

প্রকাশিত: ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সোনার দাম আরও কমলো, ভরি ২৫১১৮৪ টাকা

দেশের বাজারে সোনার দাম আরও কিছুটা কমানো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) সোনার দাম কমানো হয়েছে ৬ হাজার ৫৯০ টাকা। এতে এক ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার ১৮৪ টাকা।

স্থানীয় বাজারে তেজাবী সোনার (পাকা সোনা) দাম কমার পরিপ্রেক্ষিতে এই দাম কমানো হয়েছে। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট থেকে নতুন দাম কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটি বৈঠকে করে এই দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরে কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এর আগে গতকাল রাতে ঘোষণা দিয়ে আজ থেকে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম কমানো হয় ১ হাজার ৯২৫ টাকা। রাতের সিদ্ধান্তের পর সকাল হতেই এখন দাম আরও কমানোর সিদ্ধান্ত আসলো।

এখন সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনায় ৬ হাজার ৫৯০ টাকা কমিয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার ১৮৪ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনায় ৬ হাজার ২৯৮ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৭৫৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনায় ৫ হাজার ৩৬৫ টাকা কমিয়ে নতুন দাম ২ লাখ ৫ হাজার ৫২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনায় ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা কমিয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৯৫ টাকা।

এর আগে গতকাল ঘোষণা দিয়ে আজ সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনায় ১ হাজার ৯২৫ টাকা কমিয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৭৪ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনায় ১ হাজার ৮৬৬ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৫২ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এছাড়া ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনায় ১ হাজার ৬৩৩ টাকা কমিয়ে নতুন দাম ২ লাখ ১০ হাজার ৮৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনায় ১ হাজার ৩৪১ টাকা কমিয়ে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৬৯ টাকা। আজ সকাল ১০টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত এই দামে সোনা বিক্রি হয়েছে।

সোনার দাম কমানো হলেও রুপার দাম অপরিবর্তিত। ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ২৯০ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৬ হাজার ৯৪০ টাকা, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৫ হাজার ৯৪৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির এক ভরি রুপার দাম ৪ হাজার ৪৩২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।


সন্ধ্যায় শপিংমল-দোকান বন্ধ হওয়ায় বিক্রিতে ধস, ধাক্কা বৈশাখী বাজারেও

প্রকাশিত: ০৯ এপ্রিল, ২০২৬

সন্ধ্যায় শপিংমল-দোকান বন্ধ হওয়ায় বিক্রিতে ধস, ধাক্কা বৈশাখী বাজারেও

দেশে জ্বালানি সাশ্রয়ে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শপিংমল ও দোকান বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তে বেচাকেনায় ধস নেমেছে। বিক্রি কমে গেছে অর্ধেকেরও বেশি।

বিক্রেতারা বলছেন, সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শপিংমল ও দোকানে ক্রেতা থাকে না। ক্রেতারা আসেন বিকেলে ও সন্ধ্যার পরে। এ সময়ই মার্কেটে ক্রেতা আসেন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। আর এ কারণেই বিক্রি কমে গেছে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ।

ক্রেতারাও বলছেন, অফিস ও কাজ শেষে প্রয়োজনীয় কেনাকাটাও করতে পারছেন না না তারা।

মার্কেট ও দোকানপাট সন্ধ্যা ৭টায় বন্ধ হওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে পহেলা বৈশাখ কেন্দ্রিক বাজারে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা এসেছে। নির্বাচিত নতুন সরকারের সময়ে পহেলা বৈশাখ কেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা ছিলো আকাশচুম্বী। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের নেওয়া এই সিদ্ধান্তে প্রস্তুতকৃত নানা পণ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। কারণ, বৈশাখের পরে আর এসব পণ্যের ক্রেতা থাকবে না।

এমন প্রেক্ষিতে দোকান মালিক সমিতির নেতা ও একাধিক সংগঠন এখনও দাবি করছেন যাতে দুপুর ১২টায় দোকান খুলে রাত ৯টা পর্যন্ত ব্যবসা করা যায়। সন্ধ্যা ৬টার পরিবর্তে সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টা করা হলেও তা কোনো ইতিবাচক প্রভাব আনবে না বলে মন্তব্য তাদের। অন্তত পহেলা বৈশাখের আগ পর্যন্ত রাত ৯টা পর্যন্ত শপিংমল ও দোকান খোলা রাখার দাবি রয়েছে কোনো কোনো ব্যবসায়ীর।

যা বলছেন সাধারণ ও কর্মজীবী মানুষ

পুরান ঢাকার চকবাজারে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন শাহীন মিয়া। মাকে নিয়ে এবার তিনি হজে যাবেন। তবে এখনও হজের কেনাকাটা করতে পারেননি।

শাহীন মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের দোকান বন্ধ হয় সন্ধ্যা ৭টায়। সেখান থেকে ফিরে যে মার্কেটে যাবো তার উপায় নেই। ৭টার মধ্যে শপিংমলও বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে রাতে যে মার্কেটে যাবো সেই উপায় নেই। হয়তো পুরো একদিন দোকান বন্ধ রেখেই মার্কেট করতে হবে।’

গাজীপুরের টঙ্গীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাহবুব হাসান সজীব।বার্তা বেলা নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমাদের অফিস এখনও আগের নিয়মেই চলছে, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। আগামী বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়ি যাবো। ভেবেছিলাম তার আগেই বৈশাখের কেনাকাটা করবো। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টায় মার্কেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখনও কেনাকাটা করতে পারিনি। অফিস বাদ দিয়ে তো আর মার্কেটে যাওয়া যাবে না।’

 বলছেন সাধারণ দোকানিরা

বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে নারীদের পোশাক বিক্রি করেন ফ্যাশন লেডির কর্ণধার মনির। এই কাপড় বিক্রেতা বলেন, ‘ঈদের মৌসুমেই কাপড়ের মূল বিক্রি। আর আমরা যেসব পোশাক বিক্রি করি তা মূলত মৌসুম কেন্দ্রিক। তবে এই সময়ে যে পরিমাণ বিক্রি হওয়ার কথা ছিলো, দোকান বন্ধ থাকায় সেই বিক্রি হচ্ছে না।’

রাজধানীর মহাখালীর এসকেএস টাওয়ারে পাইকারিতে কসমেটিক্স বিক্রি করেন হাসিব। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘এখন সকাল ৯টার মধ্যে দোকান খুলে সন্ধ্যা ৭টায় বন্ধ করতে হচ্ছে। কিন্তু সকালে কোনো ক্রেতা থাকে না। বিকেলের দিকে ক্রেতা আসতে শুরু করলেই দোকান বন্ধ করার সময় এসে যায়। নতুন এই সিদ্ধান্তে বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।’

মোবাইল মার্কেটে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে জানতে চাইলে বসুন্ধরা সিটির তানভীর টেলিকমের তানভীর জাগো নিউজকে বলেন, ‘মানুষ অফিস-আদালতে কাজ শেষ করে ৩টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে মার্কেটে আসে। ইলেকট্রনিক্স ও মোবাইলের কেনাকাটা করতে ২ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। কিন্তু ততক্ষণে ৭টা বেজে যায়। তাড়াহুড়া করে আমাদের হিসাব করতে হয় এবং দোকান বন্ধ করতে হয়। এতে হ-য-ব-র-ল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনেক ক্রেতা এসে মার্কেটের বাইরে অপেক্ষা করেন। কেউ কেউ ফিরে যান। ঢাকার বাইরে থেকে আসা ক্রেতারা বলেন- ভাই ওই মোবাইলটা নিয়ে বের হন। কিন্তু মার্কেটের বাইরে নিয়ে তো আর মোবাইল বিক্রি করা যাবে না। আমাদের বিক্রিও অনেক কমে গেছে।’

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কণ্ঠেও উদ্বেগ

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রতিষ্ঠান অর্লিনস লেদারস অ্যান্ড ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাহমিনা আক্তার শাম্মী জাগো নিউজকে বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে এসএমই খাতে বিশাল বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের ব্যবসায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে বিক্রি কমে যাওয়া। আগে সন্ধ্যার পর, বিশেষ করে ৬টার পরে আমাদের বেশি বিক্রি হতো। কিন্তু এখন দোকান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করে দিতে হচ্ছে, ফলে আয় অনেক কমে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের হাজারীবাগ ও লেক সিটির শোরুম- দুই জায়গাতেই একই অবস্থা। সন্ধ্যা ৭টার পরে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছি। দোকান ভাড়া, স্টাফদের বেতন, ফ্যাক্টরি খরচ- সবকিছু চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

ফ্যাশন হাউজের মালিক ও নেতারা যা বলছেন

পোশাক ব্র্যান্ড বিশ্বরঙ-এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করার সিদ্ধান্তে বৈশাখের ব্যবসায় মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বাস্তবতা হলো, মানুষ সাধারণত সন্ধ্যার পরই শপিংয়ে আসে। এখন সময় কমে যাওয়ায় ক্রেতারা ঠিকমতো মার্কেটে আসতে পারছেন না, ফলে আমাদের বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।’

‘আমরা চাই, সকালবেলার সময়টা যদি কম গুরুত্ব পায়, তাহলে দোকান খোলার সময় কিছুটা পিছিয়ে দিয়ে রাত পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হোক—ধরেন রাত ৯টা বা ১০টা পর্যন্ত। এতে অন্তত ক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যে এসে কেনাকাটা করতে পারবেন।’

বিপ্লব সাহা বলেন, ‘বৈশাখকে কেন্দ্র করে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এই সময়ের জন্য বিশেষভাবে তৈরি পণ্য-যেমন টেপা পুতুল, শখের হাড়ি, কুলা, বিভিন্ন কারুশিল্প—এসব সারা বছর বিক্রি হয় না, শুধু বৈশাখেই চাহিদা থাকে। এসব পণ্যের সঙ্গে গ্রামের অসংখ্য মানুষ জড়িত। তারা যদি এই সময় পণ্য বিক্রি করতে না পারেন, তাহলে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে এবং দেনা-পাওনা শোধ করাও কঠিন হয়ে যাবে।

এ বছর আমরা অনেক আশা নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বৈশাখের আগে কিছুটা সময় পেয়েছিলাম, তাই আয়োজনও ভালো ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সব আয়োজন কার্যত ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। দোকান খোলা না থাকলে বা সময় সীমিত থাকলে ব্যবসা কীভাবে চলবে? আমার কাছে বিষয়টা খুব সরল- এই কয়েকটা দিন মার্কেট খোলা রেখে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হোক। এরপর চাইলে ১৫ এপ্রিলের পর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। আগে আমাদের বাঁচতে দিতে হবে, তারপর অন্য বিষয় চিন্তা করা যাবে।’ বলছিলেন বিপ্লব সাহা।

ফ্যাশন হাউস ‘সাদাকালো’র অন্যতম উদ্যোক্তা ও ফ্যাশন এন্টারপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) সভাপতি আজহারুল হক আজাদ বার্তা বেলা নিউজকে বলেন, ‘মার্কেট সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্তে ব্যবসায় তেমন কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি, বরং পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। আমরা শুরু থেকেই বলেছি-সময়টা পুনর্বিন্যাস করা দরকার। সকাল ১০টা থেকে খোলার বদলে দুপুর ১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখলে বেশি কার্যকর হতো। কারণ বাস্তবতা হলো, দিনে যেখানে ৪০ শতাংশ ক্রেতা আসে, সেখানে সন্ধ্যার পর আসে প্রায় ৬০ শতাংশ। এখন সময় সীমিত থাকায় আমাদের বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে।’

আজহারুল হক আজাদ বলেন, ‘এটি নিয়মিত ব্যবসার জন্য বড় ধরনের আঘাত। এর সঙ্গে সামনে বৈশাখ থাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সাধারণত এ সময় বৈশাখকে কেন্দ্র করে বাজারে ব্যাপক কেনাকাটা শুরু হয়, কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। জ্বালানি সংকটসহ সার্বিক পরিস্থিতির কারণে মানুষ কিছুটা দ্বিধায় রয়েছে- বৈশাখ কীভাবে উদযাপিত হবে, সেটি নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে।’

আজহারুল হক আজাদ আরও বলেন, ‘সময় কমে যাওয়ার প্রভাবও পড়ছে। বৈশাখ মানেই উৎসব, অনুষ্ঠান- তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আয়োজন কতটা হবে, তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে ক্রেতারা এখনো পুরোপুরি বাজারমুখী হচ্ছেন না। যদিও এবার ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি আগের কয়েক বছরের তুলনায় ভালো ছিল। কারণ গত কয়েক বছর বৈশাখ ঈদের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আলাদা করে প্রস্তুতির সুযোগ ছিল না। কিন্তু এবার ঈদের পর ১০ থেকে ১৫ দিনের একটি সময় পাওয়া গিয়েছিল, তাই সবাই বেশি করে প্রস্তুতি নিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রস্তুতির সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে আমরা এখনো সংশয়ে আছি। এ অবস্থায় আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, সকালের সময় কমিয়ে দিয়ে মার্কেট অন্তত রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হোক। তাহলে অন্তত ব্যবসা কিছুটা সচল রাখা সম্ভব হবে।’

রাত ৯টা পর্যন্ত সময় বাড়ানোর দাবি

সারাদেশে দোকান, বাণিজ্য বিতান ও শপিংমল খোলা রাখার বিষয়ে সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি।

দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি বলছে, তারা দুপুর ১২টায় দোকান-শপিংমল খুলে রাত ৯টা পর্যন্ত ব্যবসা করার সুযোগ চান। একই দাবি রয়েছে অন্যান্য সংগঠনগুলোরও।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুর রহমান টিপু বার্তা বেলা নিউজকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়েছেন। সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৈনিক বেচাকেনা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমে গেছে। কারণ আমাদের অধিকাংশ কাস্টমারই সন্ধ্যার পর আসেন, এটা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক বাস্তবতা, যা হঠাৎ করে বন্ধ করা সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় আমরা বিকল্প হিসেবে কিছু প্রস্তাব দিয়েছি। যেমন- সকালবেলা দোকান খুলে রাতে পর্যন্ত চালু রাখা, অথবা প্রয়োজনে দুপুর থেকে কার্যক্রম শুরু করা, যে কোনো সমন্বিত সমাধানে আমরা রাজি আছি, যদি এতে ব্যবসা কিছুটা টিকে থাকে।’

দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির এই নেতা আরও বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, আয় কমলেও খরচ একটুও কমেনি। আমাদের দোকান ভাড়া দিতে হচ্ছে, সার্ভিস চার্জ দিতে হচ্ছে, স্টাফদের বেতন দিতে হচ্ছে। দোকান মালিকরা তাদের ভাড়া ঠিকই নিচ্ছেন, কিন্তু যারা ব্যবসা পরিচালনা করছি, আমরা কোথায় যাবো? মাস শেষে এসব খরচ তো আমাদের দিতেই হবে। এক মাস যদি আমাদের আয় না থাকে, তাহলে আমরা সেই পুঁজি পাবো কোথায়? ইতোমধ্যে অনেক ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়ে ফেলেছেন। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর সমাধান না এলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।’


জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে পরামর্শক খাতেই ৩২২ কোটি টাকা আবদার

প্রকাশিত: ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে পরামর্শক খাতেই ৩২২ কোটি টাকা আবদার

বিশ্বব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) ঋণ সহায়তায় জরুরি সেবা দিতে একটি নতুন প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। প্রকল্পে নানা ধরনের পরামর্শক-সেমিনার-গবেষণা-প্রশিক্ষণ-সার্ভে খাত দেখিয়ে ব্যয় চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গাড়ি ভাড়া খাতে ৪০ কোটি এবং ভ্রমণে ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগ।

স্ট্রেনদেনিং হেলথ ইমার্জেন্সি প্রিভেনশন, প্রিপেয়ার্ডনেস, রেসপন্স অ্যান্ড রেজিলেন্স উইথ ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক প্রস্তাবিত প্রকল্পে এ ব্যয় চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা করবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে আইডিএ ঋণ সহায়তায়। আইডিএ তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দেয়, যেখানে সার্ভিস চার্জ প্রায় শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং সুদহার প্রায় ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে মোট সুদের হার প্রায় ২ শতাংশ। এছাড়া উত্তোলন না হওয়া অর্থের ওপর বছরে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি দিতে হয়। ঋণের গ্রেস পিরিয়ড পাঁচ বছর এবং পরিশোধের সময়সীমা ৩০ বছর।

তবে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে সুদের হার ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা প্রকল্প ব্যয় ও পরিশোধের চাপ বাড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের মোট ঋণ প্রস্তাব ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা।

আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের স্বাস্থ্য উইংয়ের যুগ্মপ্রধান মানস মিত্র বার্তাবেলা নিউজকে বলেন, মাত্র প্রকল্পটির প্রস্তাবনা এসেছে পরিকল্পনা কমিশনে। এখনো পিইসি সভা হয়নি। তবে সামনে সভা হবে এজন্য একটি ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করেছি। প্রকল্পে গাড়ি ভাড়া ব্যয় বাবদ ৪০ কোটি, এছাড়া ভ্রমণ ব্যয়সহ সব কিছু নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা এটা জানতে চাইবো। তবে প্রকল্পটি একেবারে প্রাথমিক ধাপে আছে। এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হবে। প্রকল্পটি নিয়ে আমরা প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ করেছি। সব ব্যয় নিয়ে আলোচনা হবে।’

প্রকল্পে গাড়ি ভাড়া খাতে ৪০ কোটি ও ভ্রমণ ব্যয়ে ১২০ কোটি টাকা প্রস্তাবের সমালোচনা করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বার্তাবেলা নিউজকে বলেন, ‘দেশে অনেক প্রকল্পেই মূল কাজের চেয়ে আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় বেশি হয়, যা নতুন কিছু নয়।’

তিনি বলেন, ‘অতীতে এমন প্রকল্পও দেখা গেছে যেখানে পরামর্শক, সেমিনার ও অন্যান্য খাতে ব্যয় থাকলেও মূল কার্যক্রমে গুরুত্ব কম ছিল। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই বিভিন্নভাবে সুবিধাভোগী হন। প্রকল্পটি যেহেতু পরিকল্পনা কমিশনে গেছে, তাই সরকারের উচিত বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করা, যাতে অযৌক্তিক ব্যয় অনুমোদন না পায়। যৌক্তিকভাবে সব কিছু ব্যয় করা উচিত।’

মুজেরি আরও বলেন, ‘এ ধরনের ভুল বারবার হলেও দায় নির্ধারণ বা শাস্তির নজির খুব কম। প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে জনগণের কল্যাণে ব্যয় নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন প্রচেষ্টা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’

প্রকল্পের মূল কার্যক্রম

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সংক্রামক ব্যাধির প্রাথমিক সতর্কতা ও নজরদারি ব্যবস্থার সহায়ক হবে। অগ্রাধিকারমূলক স্বাস্থ্য হুমকি প্রতিরোধ, স্থিতিস্থাপকতা ও প্রতিক্রিয়া উন্নত করা, স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা, কার্যকর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও জ্ঞান ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে প্রকল্পটি। এছাড়া তিনটি মন্ত্রণালয়কে সহজতর পদ্ধতি ও দ্রুত তহবিল বরাদ্দের মাধ্যমে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম করবে।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য একটি সহনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতির জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানো ও প্রতিক্রিয়ার জন্য জাতীয় ক্ষমতা উন্নত করা।

মোট ব্যয়

প্রকল্পের মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ২ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটি অনুমোদনের পরে চার বছর মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটি সারাদেশে বাস্তবায়িত হবে।

কোন খাতে কত ব্যয়

পরিকল্পনা কমিশন থেকে জানা যায়, প্রকল্পের পরামর্শক খাতে ব্যয় চাওয়া হয়েছে ৩২২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১১ শতাংশ। ৩৯৭ কোটি ৫ লাখ টাকার স্থানীয় আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১৩ শতাংশ। এছাড়া ১২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকার সেমিনার ওয়ার্কশপ ব্যয় চাওয়া হয়েছে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৪ দশমিক ২ শতাংশ। ৩০৯ কোটি টাকা আদার বিল্ডিং স্ট্রাকচার খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কি উপকার হবে, তা প্রকল্প প্রস্তাবনায় সুস্পষ্ট নয়, এ বিষয় বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিশন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের (পিএমইউ) ৮০ কোটি ৮৬ লাখ টাকার পরামর্শক, ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার প্রশিক্ষণ, ১০ কোটি ৯৮ লাখ টাকার সেমিনার ব্যয়, ২ কোটি টাকার গবেষণা এবং ২ কোটি টাকার সার্ভে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ কীভাবে ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ কার্যকর বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে তার কোনো ব্যাখ্যা প্রকল্পে নেই। একইভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন ইউনিটে ১৩৪ কোটি টাকার পরামর্শক, ১৬৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকার প্রশিক্ষণ, ১০২ কোটি ৪০ লাখ টাকার সেমিনার, ২৭ কোটি টাকার গবেষণা এবং ১২ দশমিক ৬৭ কোটি টাকার সার্ভে' ব্যয় ধরা হয়েছে। এ ব্যয় প্রস্তাবের যথার্থতা নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

আরও একটি অংশে ৫৪ কোটি ৭১ লাখ টাকার পরামর্শক ব্যয়, ১৩২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রশিক্ষণ, ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সেমিনার এবং ৭৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার সার্ভে ব্যয় চাওয়া হয়েছে। এ ব্যয় প্রস্তাবের যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছে না কমিশন। ফলে এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। প্রকল্পের বন অধিদপ্তর অংশে ৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকার পরামর্শক ব্যয়, ৫৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকার স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার পিএইচডি প্রোগ্রাম, আড়াই কোটি টাকার পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা, ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ওয়ার্কশপ, ৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সার্ভে ইত্যাদি খাতের ব্যয় চাওয়া হয়েছে। যার কোন যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছে না কমিশন। প্রকল্পে ক্রস বর্ডার সার্ভিলেন্স প্রিভেনশন বাস্তবায়নে ৪৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, এর আওতায় কি কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মেডিসিন অ্যান্ড ভ্যাকসিন খাতে ১২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা, আদার বিল্ডিং অ্যান্ড স্ট্রাকচার খাতে ১২৮ কোটি ৮৬ লাখ, ল্যাবরেটরি ইকুইপমেন্ট খাতে ২৬০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, প্রকল্পের কার্যক্রম বাংলাদেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং এর প্রভাব দেশজুড়ে তথা প্রতিবেশী দেশগুলোতেও বিস্তৃত হবে। তবে, মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি এবং প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য জরুরি সেবা দেওয়ার উদ্দেশে তিনটি খাতের (মানব, প্রাণী ও পরিবেশ) জরুরি ল্যাবরেটরি সক্ষমতা স্থাপন উন্নয়ন আধুনিকায়ন উন্নীতকরণ এবং একটি কার্যকর ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক গঠনের লক্ষ্যে কিছু নির্দিষ্ট স্থানে প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হবে। তবে প্রকল্পের সমীক্ষা প্রতিবেদন কোনো সংস্থার মাধ্যমে করা হয়েছে তা সুস্পষ্ট নয়, সমীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্পের যথার্থতা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে অথবা তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা জরুরি। বাংলাদেশ ছাড়াও আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নয়ন সহযোগীর প্রকল্প ঋণের মাধ্যমে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে কি না তার তথ্য জানতে চেয়েছে কমিশন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর

একটি সহনশীল প্রাণিস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়ার জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানো। প্রধান লক্ষ্য হলো: টেকসই রোগ নির্ণয় সক্ষমতা নিশ্চিত করতে জাতীয় ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্কের উন্নয়ন, খাদ্য শৃঙ্খলের সর্বস্তরে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালীকরণ, নজরদারি, আগাম সতর্কতা, মহামারি প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা জোরদার করা ও মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা উন্নয়ন।

বাংলাদেশ বন বিভাগ

প্রাণিজ উৎসজনিত রোগ নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একটি সহনশীল বন্যপ্রাণী স্বাস্থ্য ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়া।